“বৃদ্ধাশ্রম” -শব্দটা এখনো আমাদের অনেকের কাছে কষ্টদায়ক, আবার অনেকের কাছে পরিচিত রুটিন। একটা সময় ছিল, যখন এই দেশের মানুষ এ ধরনের শব্দ শুনে বলতো, “ধিক সেই সন্তানকে, যে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়।”
আজ সেই সমাজেই বৃদ্ধাশ্রম গুলো দিন দিন বাড়ছে। মানুষ এখন “উন্নত জীবন” এবং “পার্সোনাল স্পেস” -এর নামে বাবা-মায়ের দায়িত্ব এড়িয়ে চলে। না, সমস্যা প্রযুক্তির নয়, সমস্যাটা মানুষের হৃদয়ে। মানুষ এখন আর সম্পর্ক বজায় রাখে না -বেছে নেই সুবিধা।
নায়লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের একজন ছাত্রী। তার থিসিসের বিষয়:
“বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীনদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন এবং পারিবারিক সম্পর্কের প্রতিফলন”।
সে প্রথমে কিছুটা আনমনে হয় বৃদ্ধাশ্রমে যায়। ভেবেছিল, বয়স্কদের গল্প শোনাবে, কিছু প্রশ্ন করবে, রিপোর্ট জমা দিবে -ব্যাস। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে পা রাখতেই তার ভেতরের জগত কাপঁতে শুরু করে।
বৃদ্ধাশ্রমের নাম: “সন্তান হীন শান্তিনিকেতন” -নামটা দেখেই কষ্ট লাগে। নায়লা ভেতরে প্রবেশ করে। সাদামাটা ভবন, দোতলা। নিচে ছোট একটা বাগান,কয়েকটা চেয়ার। এক বৃদ্ধা ফুল গাছে পানি দিচ্ছেন। বৃদ্ধার কাছে গিয়ে নায়লা বলে, “দাদি, আপনি এই গাছগুলো লাগিয়েছেন “? বৃদ্ধা মৃদু হেসে বলে, ” না, মা। এগুলো লাগিয়েছে আমার ছেলে, রাকিব… স্কুলে পড়ার সময়। এখন সে কানাডা থাকে। আমি এসব দেখি, যেন আমার সন্তানকে দেখি। ”
নায়লার বুক ভার হয়ে আসে। সেভাবে, যে ফুলের জন্য তার মা প্রতিদিন পানি দেন, সেই ছেলেই মাকে রেখে গেছেন এখানে। তারপর নায়লা ঘরে ঢুকে দেখতে পাই অনেকজন মানুষ বসে আছেন। নায়লা দেখতে পায়, একজন মানুষ একা একা বসে আছেন সবার থেকে আলাদা। নাম:আমিনা, বয়স আনুমানিক ৮০, শাড়িটা পরিপাটি, চোখেমুখে শোকের রেখা। নায়লা তার কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, -“দাদি, আপনি এখানে কিভাবে এলেন”?
-“আমি আসিনি মা, আমাকে এখানে রেখে গেছে ওরা।”
নায়লা:কারা?
-“আমার ছেলে -মেয়েরা। আমার ছেলের বউ বলত, আমি নাকি বাসায় অশান্তি তৈরি করি।আমি শুধু একদিন বলেছিলাম, -নাতি ফোনে বেশি সময় দেয়, নামাজ পড়ে না। সেই থেকে আমার মুখেই যেন বিষ।”
আচঁলে মুখ মুছে আমিনা বলেন: “তারা আধুনিক হয়েছে। তাই বৃদ্ধ মা এখন তাদের সমস্যা”।
আব্দুল কাদের। নায়লা গিয়ে তার সাথেও কথা বলেছে। কাদের সাহেব জানালেন, তিনি ছিলেন ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজার। তিনি বাড়িতে থাকাকালীন দিনে একবার কথা বলার মত কোন লোক খুঁজে পেতেন না। বউ -ছেলে অফিসে, নাতনি কোচিংয়ে। বাথরুমে পড়ে যাওয়ার পর তিন দিনের মাথায় থাকে বৃদ্ধাশ্রমে আনা হয়।
-“তবে এখানে আমি অন্তত কিছু মানুষের মুখ দেখি, গল্প করি। ওই ঘরের আবদ্ধতা থেকে এটা ভালো। “নায়লা বললেন, “আপনার সন্তানরা আসেন না”?
-না, মা। কিন্তু আমি রাগ করি না। তারা যেন সুখে থাকে, এতেই শান্তি।
আব্দুল কাদের সাহেবের এসব কথা শুনে নায়লার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তারপর, নায়লা দেখা করে হাসিনা খালা ও রফিক চাচার সাথে। এই দুজন কেউ কারো আত্মীয় না, কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে তাদের বন্ধুত্ব হয়। প্রতিদিন বিকেলে তারা বাগানে বসে গল্প করেন। একদিন নায়লা কাছে গিয়ে বসে।
হাসিনা খালা বলেন:-“জানো মা, আমি সংসার করিনি। বাবার দেখাশোনা করে কাটিয়ে দিয়েছি জীবনটা। এখন কারো কাছে বোঝা না হয়ে নিজেই চলে এসেছি বৃদ্ধাশ্রমে।”
রফিক চাচা বলেন: -“আমার তিন ছেলে। তিন বাড়ি -প্রত্যেকের কাছেই অভিমানিত হয়েছি। তখন বুঝেছি, আমি যেখানে খুশি, সেখানে মরার অধিকার রাখি।
নায়লা -“আপনাদের কি দুঃখ কষ্ট হয় না”?
-না। মা। এখন কেউ কটু কথা বলে না, শুধু চুপ করে সবাই বেঁচে আছি।
তিন সপ্তাহ পর, একদিন এক দামি গাড়ি এসে দাঁড়ায় বৃদ্ধাশ্রমের গেটের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে আসে এক ভদ্রলোক শার্ট-প্যান্ট পরা, চশমা, হাতে মোবাইল। সে আগে রোকিয়া বেগমের কাছে -বৃদ্ধাশ্রম এর আরেক বাসিন্দা রোকেয়া বেগম । সে এসে বলেছে, মা’র নামে একটা ফ্ল্যাট হস্তান্তরের কাগজে সই দরকার।
নায়লা পাশে দাঁড়িয়ে। রোকেয়া বেগম বলেন, -বাড়িটা তো আমার ছেলের, আমি শুধু নাম দিয়েছিলাম। এখন সেটাও নিতে এসেছে?
নায়লা কাগজের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনার ছেলেকে বলুন, আপনার প্রাপ্য শুধু বাড়ি নয়- ভালোবাসাও। ওটা আদায় না করে কিছু সই করবেন না।”
ছেলে কিছু না বলে কাগজ নিয়ে চলে যায়।
এবার, নায়লার সময় শেষ। তার থিসিস লেখা শেষ। কিন্তু তার হৃদয়ে একটা নতুন সত্য গেঁথে গেছে। বিদায়ের দিন আমিনা থালা থাকি জড়িয়ে ধরে বলেন, “তুই আমার নিজের মেয়ের থেকেও আপন হয়েছিস মা। তুই আসবি তো মাঝে মাঝে”।
নাইলা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, -আমি শুধু আসবো না। আমার সন্তানদের তোমাদের কাছে নিয়ে আসব। যাতে তারা শিখে, কিভাবে মা -বাবার পাশে থাকতে হয়।
নায়লার থিসিস থেকে উদ্ধৃতি: “এই সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, কারণ আমাদের হৃদয়ের স্থান কমছে। পিতা-মাতাকে দায়িত্ব মনে করা হয়, ভালোবাসা নয় -সেখানে সম্পর্ক টিকে না। আমরা যদি এখনই না জাগি, তবে একদিন আমাদের সন্তানরাও আমাদেরকে ঠাঁই দেবে একই ঘরে -যার নাম বৃদ্ধাশ্রম। সময় আছে, ফিরে আসো। বাবা মা মানে বোঝা নয়, তারা আশীর্বাদ”।

