লেম্পুদা ও রক্ত রহস্য
সৌরভ হাছান হিমেল
স্টুডিয়োর ভেতরে বাতাসের গন্ধটা আজ ভারী। দামি লিনসিড অয়েল আর তার্পিনের চিরচেনা গন্ধ ছাপিয়ে একটা কটু রক্তের ঘ্রাণ নাকে ধাক্কা দিচ্ছে ডিটেকটিভ লেম্পুদা’র। মেঝেতে পড়ে আছেন দেশের শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী সাদিক হোসেন। সেই দৃশ্য— সাদিকের সাদা সিল্কের পাঞ্জাবি ভিজে গেছে বুকের রক্তে, আর তার নিথর শরীরটাকে ঘিরে মেঝেতে আঁকা হয়েছে সিঁদুরে লাল রঙের এক নিখুঁত বৃত্ত। বৃত্তের পরিধি এতই সুষম যে দেখে মনে হয় কোনো কম্পাস ব্যবহার করা হয়েছে। মারকুটে গোয়েন্দা লেম্পুদা হাঁটু গেড়ে বসলেন। তার তীক্ষ্ণ নজর মেঝে থেকে দেয়ালের দিকে গেল। সেখানে সারিবদ্ধ ক্যানভাসের মাঝে একটা বড়ো ফ্রেম শূন্য পড়ে আছে। “স্যার, এই ফ্রেমেই উনার শেষ কাজটা ছিল,” কাঁপাকাঁপা গলায় বলল সাদিক সাহেবের সহকারী সজীব। লেম্পুদা মুখ না ফিরিয়েই জিজ্ঞেস করলেন, “ছবিটা শেষ হয়েছিল?” হয়ত। স্যার গত তিন রাত স্টুডিয়োর দরজা বন্ধ করে কাজ করছিলেন। কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেননি। শুধু বলতেন— “সজীব, এই ছবি আমার জীবনের সমস্ত পাপ ধুয়ে দেবে।”
লেম্পুদা’র ভ্রূ কুঁচকে গেল। পাপ? একজন শিল্পীর কাছে ছবি কীভাবে পাপমুক্তির পথ হতে পারে? তদন্ত শুরু হতেই বেরিয়ে আসতে লাগল একের পর এক জট। সাদিকের প্রাক্তন স্ত্রী মায়া ডিভোর্সের পর থেকেই সাদিকের বিরুদ্ধে কপিরাইট চুরির মামলা লড়ছিলেন। অন্যদিকে, রহস্যময় আর্ট সংগ্রাহক মি. ডি’সুজা খুনের আগের রাতেও সাদিককে হুমকি দিয়ে একটি ই-মেইল পাঠিয়েছিলেন। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজেও কোনো সমাধা করতে পারেনি। পুলিশ মামলা সমাধা করতে না পারায় গোয়েন্দা বিভাগের দারোগা কাশেম আলির ওরফে তেতি কাইশ্যার ডাক পড়েছে। দেখতে কালো বলে লেম্পুদা তাকে আদর করে তেঁতুল রঙা কাশেম বা তেতি কাইশ্যা বলে ডাকে। কিন্তু সাদিক হত্যা মামলায় তেতি কাইশ্যাও ফেল মেরেছেন। তেতি কাইশ্যা নরমাল কোনো লোক না। একদম হেঁড়ে জিনিস একটা। সে ফেল মেরেছে মানে আসলেই কিছু একটা জটিল ঘটেছে। ফরেন্সিক, গোয়েন্দা সবাই এই মামলায় শিশু। পুলিশ কমিশনারের ব্যক্তিগত অনুরোধে লেম্পুদা মামলা সমাধানের জন্য আসেন এখানে। সেদিন সকালে লেম্পুদা কমিশনারের অফিসে গিয়েছিলো। ফরেন্সিক রিপোর্ট, পোষ্ট মর্টেম রিপোর্ট সব দেখেছিলেন লেম্পুদা। কোন ক্লু পাওয়া যায়নি। সাদিকের আঁকা একটা পাহাড়ের ছবি দেয়ালে টাঙানো। পাশে বইয়ের বড় সেলফ। শার্লক হোমস, বোমকেশ বক্সি, ফেলুদা সমগ্র, মেজর ডেভেনফোর্ড সহ সব বড় বড় গোয়েন্দা গল্পের বই। খাঁসা রুচি কমিশনারের। অবশ্য এসবই তো তিনি পড়বেনই। জাঁদরেল সরকারি আমলা বলে কথা! কিন্তু এখন লেম্পুদা’র মনে খটকা লাগছিল এই লাল বৃত্তটা নিয়ে। সন্দেহ ভাজন তো আছে অনেকেই, কিন্তু তিনি স্টুডিয়োর এক কোনায় পড়ে থাকা একগুচ্ছ পুরোনো ডায়েরি, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন সব ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন। লেম্পুদা সাদিকের একটি ডায়েরিতে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট ছবি পেলেন। ছবির পেছনে কাঁপা হাতে লেখা— “১৯৯৪, বিলাইছড়ি। আমরা চারজন এবং সেই লাল অগ্নিকুণ্ড।” ছবিতে তরুণ কালের সাদিকের সাথে আরও তিনজনকে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু বাকি তিনজনের মুখ কেউ খুব যত্ন করে ব্লেড দিয়ে ঘষে মুছে ফেলেছে। লেম্পুদা বুঝতে পারলেন, এই বৃত্তটি কোনো শিল্পকর্ম নয়। কুড়ি বছর আগের বিলাইছড়ির এক অন্ধকার রাত আজ সাদিকের দরজায় কড়া নেড়েছে। হঠাৎ লেম্পুদা’র চোখে পড়ল সাদিকের স্টুডিয়োর জানালার কাচে তুষারপাতের মতো সূক্ষ্ম ধুলো। উঁহুঁ না, ওটা তো ধুলো নয়— ওটা চারকোল পাউডার। কেউ একজন তাকে এই মুহূর্তে জানালার ওপাশ থেকে লক্ষ্য করছে। লেম্পুদা জানালার দিকে পা বাড়ানোর আগেই ছায়াটা সরে গেল। তিনি দ্রুত স্টুডিয়োর বাইরে বেরিয়ে এলেন, হাতে “আকাশ ভরা তারা” নামের পিস্তল। পিস্তল না আসলে, ওটা হলো রিভিল বার। ধোলাই খালে ষোলো চেম্বারের কাস্টমাইজড পিস্তল। কিন্তু বৃষ্টির ঝাপটায় অন্ধকার গলিতে কাউকে দেখা গেল না। শুধু কাদার ওপর আছে এক জোড়া জুতার ছাপ, পেছনের দিকে হেঁটে গেছে। যেন কেউ উলটো পায়ে হেঁটে চলে গেছে। বাইরে একটি নীল পাজেরো গাড়ি দেখা যাচ্ছে দূরে। আর আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। লেম্পুদা দৌড়ে গিয়ে ফটকের দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলো কাউকে দেখেছে কিনা? কিন্তু দারোয়ান বলল “আমি কাউকে দেখি নাই স্যার। গরিব মানুষ আমি, এসবে জড়াবেন না।” বিরক্তিতে লেম্পুদার মুখ কুঁকড়ে গেলো। ইচ্ছে হয় দারোগা তেতি কাইশ্যার হাতে তুলে দিয়ে ইচ্ছাসে পেঁদাতে। কিছু হলেই, কিছু জিজ্ঞাসা করলেই “আমি গরিব মানুষ স্যার,”, অসহ্য! হয়ত হাতে ইয়া বড়ো রিভলভার দেখেই ভয় পেয়েছে। পরদিন ভোরে ক্লু-এর আশায় লেম্পুদা সোজা চলে গেলেন সাদিকের পুরোনো বন্ধু এবং বিখ্যাত আর্ট ক্রিটিক সমীরণ বাবুর কাছে। লেম্পুদা’র সাথেও তার পরিচয় ছিলো। লেম্পুদা তাকে মজা করে আড়ালে শাহবাগী সমীরণ ডাকে। সাদিকের ডায়েরিতে পাওয়া কালিম্পং-এর পুরোনো ছবিটা টেবিলের ওপর রাখলে সমীরণ বাবুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। “এ ছবি আপনি কোথায় পেলেন গোয়েন্দা সাহেব ?” সমীরণ বাবুর গলায় আতঙ্ক। লেম্পুদা শান্ত গলায় বললেন, “সাদিকের লাশের পাশে। যদিও এটা মিথ্যা কথা, কিন্তু লেম্পুদা এভাবে সন্দেহভাজনকে ভড়কে দিয়ে মনে মনে পৈশাচিক আনন্দ পান। আবারও আবারও গলায় কাঠিন্য ফুটিয়ে বলেন, সমীরণ বাবু, ১৯৯৪ সালে বিলাইছড়িতে-এ আসলে কী ঘটেছিল। সেই চারজন কারা ছিল? সমীরণ বাবু এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারি থেকে এক পুরোনো খবরের কাগজের কাটিং বের করলেন। শিরোনাম ছিল— “পাহাড়ি বাংলোয় অগ্নিকাণ্ড, আদিবাসী কিশোরীর মৃত্যু।”। তিনি বলতে শুরু করলেন, “আমরা তখন যুবক। সাদিক, আমি, এবং আরও দুজন— রনি আর শাশ্বত। নেশার ঘোরে সেদিন আমরা সেদিন অনেক মাতলামি করছিলাম। নেশার ঘোরে সেদিন আমরা নিজেদের নাম পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিলাম। বোতলের শেষ ঢোকটা গলায় নামার পর রনি হেসে বলেছিল, “আজ রাতে কিছু আমরা অনেক মজা করব। না হলে মদ খাওয়ার মানে কী?” কথাটা আমাদের মাথায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। বাংলোর পেছনের বস্তিটা তখন অন্ধকারে ডুবে। দূরে শহরের আলো জ্বলছে। পকেটে লাইটারটা ছিল— কখন বের করেছি, মনে নেই। একটা ঘরের পেছনের শুকনো প্লাস্টিকের স্তূপে আগুনটা ধরিয়ে দিয়েছিলাম আমি। শুরুতে আগুনটা ছোট ছিল। খুব ছোট। আমরা দাঁড়িয়ে দেখছিলাম— কথায় কথায় হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছি। হঠাৎ বাতাসের দিক বদলে গেল। আগুনটা ছড়িয়ে পড়ল অস্বাভাবিক গতিতে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো বস্তির ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। শুরু হলো চিৎকার। “আগুন! আগুন!” আমাদের ভেতর তখন ধাক্কা লাগে। ধীরে ধীরে নেশা কেটে যায় আমাদের। রনি ফিসফিস করে বলল, “চল এখান থেকে… এখনই। আমরা আর দেরি করিনি। দৌড় পালিয়ে গেলাম সেখান থেকে। পেছন থেকে সমানে চিৎকার আসছে, অন্ধকার রাস্তা বেয়ে আমরা সবাই দৌড়াচ্ছিলাম। পায়ের শব্দটাও যেন খুব জোরে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল কেউ শুনে আমাদের পেছনে ধেয়ে আসবে। সেদিন আমরা পালিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের রাতটা সেখানেই শেষ হয়নি। পরে খবর পাও সেই আগুনে একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে পুড়ে মারা যায়। সাদিক কোনোদিন নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনি। সে বলেছিল, তার শেষ ছবি হবে সেই আগুনের স্মৃতি।” লেম্পুদা জিজ্ঞেস করলেন, “রনি আর শাশ্বত এখন কোথায়?” “রনি পাঁচ বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আর শাশ্বত… সে তো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এখন পাবনায়।” লেম্পুদা বুঝতে পারলেন, বৃত্তটা সম্পূর্ণ হতে এখনো দুটো নাম বাকি— সমীরণ আর শাশ্বত। তিনি তৎক্ষণাৎ সমীরণ বাবুকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়ে স্টুডিয়োতে রওয়ানা দিলেন। কিন্তু লেম্পুদার হিসাব আরেকটু বড়ো। আরেকটু হিসেব নিকেশ করতে হবে…।
সমীরণ বাবুর বাসা থেকে যখন লেম্পুদা বের হয়, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। হঠাৎ বিনা নোটিশে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো। জায়গাটা শ্যাওড়াপাড়া বাজারের কাছাকাছি, চারদিকে গর্ত, কাদা-জল, লোহা ইট। দৌড়ানো দূরের কথা, এর মধ্যে তাড়াতাড়ি হাঁটাও বিপজ্জনক। একটু দূরেই মেট্রো রেলের পিলার। বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে ভেজা বিড়াল অবস্থায় সামনের বাঁশের বেড়া দেওয়া ছাউনির দিকে ছুটে গিয়ে আশ্রয় নিলেন লেম্পুদা। বৃষ্টি ও বাতাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেলো। তাকিয়ে দেখলেন এদিক ওদিকে কয়েকটি মজমা বসেছে। আট দশ জন করে একেকটি মজমা। নানা বয়েসের, নানা চেহারার অনেক রকম লোক, সকলেই সবজি খাচ্ছেন। সবজি মানে গাঁজা। মদের আড্ডা দেওয়ার সঙ্গে গাঁজার আড্ডার পার্থক্য হলো যে এখানে সকলেই নিঃশব্দ, কিন্তু মদেও নেশায় নাচ গান সব কিছু হয়। কিন্তু গাঁজার নেশায় এসব হয় না। নিঃশব্দে একজনের হাত থেকে অন্যেও হাতে বাঁশি চলে যাচ্ছে। নিঃশব্দে গাজা টানার পদ্ধতির নাম নিমাই টান। চার পাঁচ টান দিয়ে পরের জনের হাতে তুলে দিচ্ছেন। রাস্তার মুচি, করপোরেট অফিসের বড়ো অফিসার, বাসের হেলপার, পকেটমার সকলে পাশাপাশি গোল হয়ে বসে। সবজি ফুঁকছেন। সবজি ফুরিয়ে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে সবাই টাকা দিয়ে আবার পোটলা এনে বাঁশি ভরে নিচ্ছে। কেউ কেউ সম্পূর্ণ চোখ বুজে আত্মস্থ, শুধু সময়মতো হাত উঠে যাচ্ছে পার্শ্ববর্তীর কাছ থেকে বাঁশি গ্রহণের জন্য। বৃষ্টিভেজা বাতাস আমোদিত হয়ে উঠেছে গাঁজার ঘন গন্ধে। এখানে খুব বেশি দাঁড়িয়ে থাকলেই নেশা হয়ে যাবে। বৃষ্টি আরো জোরে এসেছে এবং বাতাস কম হলেও একশ কিলোমিটার বেগে বইছে। বাইরের ঝড় বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচিয়ে এবং গাজার ধোঁয়া থেকে নাক বাঁচিয়ে পাশে ছাউনির নিচে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে ছিলেন লেম্পুদা, এমন সময়ে একটা ভদ্রলোক আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। একটু আগেই ভদ্রলোককে দেখেছি খুব আয়েশে সঙ্গে দুজন রাজমিস্ত্রীর মাঝখানে বসে গাজা উপভোগ করছিলেন। তাঁর বোধহয় নেশা করা শেষ হয়েছে, বাড়ি ফিরবেন বলে উঠে এসেছেন। একটু পরেই আমাদের মধ্যে আলাপ শুরু হলো। ভদ্রলোক নিজেই যেচে পড়ে হয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। নাম বললেন, আক্কাস আলি। আক্কাস আলি মধ্যবয়সি, মোটা পটকা টাইপ চেহারা। সামান্য ময়লা চেক লুঙ্গি ও সাদা পাঞ্জাবি গায়ে। দেখলেই বোঝা যায় মোটামুটিভাবে পুরান ঢাকার খানদানি পুরোনো লোক। কথাবার্তায় প্রকাশ পেলো তার কয়েকটা বিরিয়ানি দোকান ছিলো এই দু-চার মাস আগেও। তার মধ্যে একটির মাত্র লাইসেন্স ছিলো। ভোক্তা অধিকার অভিযান চালিয়ে অবৈধ বলে বাকি দোকানগুলো বন্ধ করে দেয়। দিনকাল ভালো যাচ্ছে না, তাই সময় পেলেই কষ্ট ভুলতে গাঁজা টেনে যান। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পরে, বৃষ্টি তখন একটু ধরে এসেছে, হাওয়ার বেগও বেশ কম, আক্কাস আলি রাস্তায় নামলেন, আমিও নামলাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “বাড়ি যাচ্ছেন ?” আক্কাস আলি একটু থেমে উত্তর দিলেন, “এই সন্দায় বাড়ি যাবো কেঠায় ? ঐ গলিত হোটেলে একটু জিলাপি খাইবার যাই।” হঠাৎ আক্কাস আলি কথা পালটে আমাকে বললেন, “আপনে বোধহয় ভাবতাচেন এই মুরুব্বি লোক গাঁজা খায় কেমতে ?” আমি তাড়াতাড়ি বললাম, “না না, এটা কেমন কথা! আক্কাস আলী কিন্তু আমার দিকে এগিয়ে এলেন, বললেন, হুনেন মিয়া ভাই, আমারে ভুল বুইঝেন না। সব রকম নেশা-ভাং কইরা দেখছি, অনেক মদ খাইচি, একটা টাইমে খানদানি মাতাল ছিলাম আমি, এই পুরান ঢাকায় সব মদের ডিলাররা আমারে দেইখা পলাইতো। কিন্তু গাঁনজা ! গাঁনজার লগে কারো তুলনাহি অয় না” সন্ধ্যায়, বৃষ্টির মধ্যে গাঁজাখোর পাল্লা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে ভদ্রতাসূচক বিদায় জানিয়ে লেম্পুদা চলে আসার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আক্কাস আলী ছাড়বার পাত্র নন। তিনি লেম্পুদাকে চেপে ধরলেন, সত্যি সত্যি তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে পড়লেন, বললেন, “কোন নেশা বড় আর কোন নেশা ছোট এই লিয়া (নিয়ে) যার যা ইচ্ছে কয় কিন্তু এ বিছয়ে (বিষয়ে) আমি বহু চিন্তা ভাবনা করচি, মনে মনে বহুত গবেষণা করচি, শেষে একটা বৈজ্ঞানিক হিছাব বার করচি আর সেই হিছাবে গাঁনজাই সেরা।” লেম্পুদা আর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না , জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন, “আপনার এই বৈজ্ঞানিক হিসেবটা কী রকম? বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে আক্কাস আলি বললেন, আরে মিয়া, নেশা মাপন লাগে আঙুল দিয়া। “আঙুল দিয়ে ?” লেম্পুদা একটু বিস্মিত হলেন। তারপর একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, মদ আঙুল দিয়ে মাপা যেতে পারে। মদের বেলায় দু আঙুলে এক পেগ, তিন আঙুলে দেড় পেগ, এ রকম হিসাব হতেই পারে।” আমাকে কথা শেষ করতে দিলেন না আক্কাস আলি, উত্তেজিত হয়ে বললেন, “থামেন তে, খালি মদ আর মদ। আপনেরা শিক্ষিত পোলাপানেরা খালি মদের কথা কন। মদ তো পাঁচ আঙুলের নেশা।” লেম্পুদা আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, “পাঁচ আঙুলের নেশা আবার কী ?” আক্কাস আলি এবার নিজের বিষয় পেয়ে গিয়ে প্রাঞ্জলভাবে বোঝাতে লাগলেন, “যত বেশি আঙুল তত বেশি উচ্চমানের নেশা। সবচেয়ে খারাপ নেশা অইলো এক আঙুলের নেশা। পানের দোকানে পাওন যায়। গুইল, আঙুলে লাগিয়ে দাঁত মাজতে হয়, এডা অইলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট নেশা ।” একটু থেমে আক্কাস আলী বললেন, “এর চেয়ে খারাপ অবশ্য চা। মাত্র আধা আঙুলের ব্যাপার। একটা আঙুল অর্ধেক করে পেয়ালার হাতলে ঢুকিয়ে দিলেই হলো। তবে চা ঠিক নেশা না মিয়া বুঝলা।” তিনি আর আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ব্যাখ্যা করে যেতে লাগলেন, “এর তে সিগারেট একটু ভালো, বিড়িও ঐ একই। দু আঙুলে ধরে বুড়ো আঙুল অর্ধেক কাত করে মুখে দিয়ে টান, ঐ আড়াই আঙুলের নেশা খুব উঁচু নয়, তবে কমও নয়।” আক্কাস আলির এই বিশ্লেষণ কখন শেষ হবে, এদিকে আবার বৃষ্টি এসে গেলো মনে হচ্ছে অথচ শুনতেও খারাপ লাগছে না লেম্পুদার। এরকম আগে আর কখনো শুনেননি তিনি । আক্কাস আলী সামান্য বিরতি দিয়ে আবার শুরু করে দিয়েছেন”এর মদ্দে (মাঝে) আরো বহুত রকম নেশা আছে সে সব বাদ। আপনে মদের কথা কইতাছিলেন, মদ অইলো পাঁচ আঙুলে নেশা। পাঁচ আঙুলে গেলাস ধরে মুখে তুলতে হইবো। সোজা বোতল থেকে গলায় ঢাইলা খাইলেও ঐ পাঁচ আঙুলই। তবে গাজার কাছে কিচ্ছু না।” এই বলে তিনি দুটো হাত জোড় করে একটি কাল্পনিক কলকে মুখের কাছে ধরে দুবার জোরে জোরে টান দিয়ে বললেন, “একেবারে পুরো দশ আঙুলের নেশা। হাতের দশ আঙুলে কলকে ধরতে অইবো। এর থেইক্কা বড়ো নেশা অয় না।” বৃষ্টি প্রায় এসে গেলো, আবার, লেম্পুদা বেরিয়ে যেতে চাইলেন। আক্কাস আলি হাতের মুঠোটা দিয়ে লেম্পুদাকে হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন, “শেষ কথাটা শুইনা যান। বিশ আঙুলের নেশাও আছে সেও ঐ গাঁজাই কুষ্টিয়ার লালন মেলায় গেলে দেখবেন, বট তলায় ভিড়, সাধকরা গাঁজা খাইতাছে। দুই হাতে এক বাঁশি, দুই পায়ে আরেকটা বাঁশি। দুই হাতের বাঁশি থেইকা একটান, দুই পায়ের বাঁশি থেইকা একটান এভাবে টাইনা যাইতাছেন। “এতক্ষণে পুরোদমে বৃষ্টি এসে গেছে। আক্কাস আলির হাত এক ঝাঁকুনি দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আবার ভিজতে ভিজতে বাসার সাদিকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন লেম্পুদা । “বুড়া ভাম একটা” মনে মনে গালি দিলো লেম্পুদা। কিন্তু হুট করে লেম্পুদার মাথায় ডোপামিন বয়ে গেলো। একটা শব্দ তার কানে বাজছে। আঙুল! আঙুল আঙুল! তার মনে হলো, সাদিকের সেই নিখোঁজ ছবিটার ভেতরেই খুনি কোনো সংকেত রেখে গেছে। স্টুডিয়োতে ঢুকে তিনি মেঝেতে আঁকা সেই লাল বৃত্তটির কেন্দ্রে গিয়ে দাঁড়ালেন। আরিয়ান যখন মেঝেতে পড়ে ছিলেন, তার আঙুল একটা নির্দিষ্ট দিকে নির্দেশ করছিল। লেম্পুদা সেই রেখা বরাবর দেয়ালের দিকে তাকালেন। সেখানে একটি বিশাল অয়েলিং পেইন্টিং ঝুলছে— একটি শান্ত সূর্যাস্তের দৃশ্য। লেম্পুদা একটি ছুরি নিয়ে সেই সূর্যাস্তের ছবিটা আলতো করে চিরে ফেললেন। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল আসল সেই মাস্টারপিস। কিন্তু ছবিটা দেখে লেম্পুদার শিরদাঁড়া দিয়ে হিম স্রোত বয়ে গেল। ছবিতে কোনো পাহাড় বা আগুন নেই। সেখানে আঁকা হয়েছে একটি অপারেশন থিয়েটার, আর টেবিলে শুয়ে থাকা একটি মেয়ে, যার মুখটা হুবহু সেই কালিম্পং-এর মৃত কিশোরীর মতো। আর সেই ডাক্তার হিসেবে যে দাঁড়িয়ে আছে, তার মাস্ক পরা চোখের চাহনিটা খুব চেনা। সেই চাহনি পুলিশ কমিশনারের । ঠিক সেই মুহূর্তে স্টুডিয়োর দরজায় একটা শব্দ লেম্পুদা। লেম্পুদা ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন কমিশনার দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে একটি এন্টি কাটার । তার চোখে সেই একই উন্মাদনা, যা ছবিতে সাদিক ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কমিশনার হাসলেন। “সাদিক শিল্পী মানুষ, মরার আগেও নিখুঁত ছবিটা এঁকে গিয়েছিল। জানতেন লেম্পুদা ? ওই মেয়েটি আমার ছোট বোন ছিল। ২০ বছর ধরে আমি এই দিনটার অপেক্ষা করেছি।” লেম্পুদা বললেন “মালটা যে তুমি আগেই বুঝেছিলাম, তাই তোমাকে আটকের কোন ত্রুটি রাখিনি। পেছনে তাকাও। তেতি কাইশ্যা তার গ্যাং নিয়ে দাঁড়াই আছে। আর সামনেও এসোনা । হাতে দেখেছো তো? আকাশ ভরা তারা লোড করাই আছে। শরীরে নয়টা ছিদ্র আছে আরো ১৬ টা ছিদ্র বাড়াইওনা কমিশনার। নিজেকে কাইশ্যার হাতে তুলে দেও…।
পুরান ঢাকার লেম্পুদা’র বাসায় প্রতিদিনের মত আজকেও আড্ডা বসেছে। যতবারই কোনো জটিল কেসের পর্দা ফাঁস হয়, ততবারই এই ঘরটায় মানুষ জড়ো হয়—লেম্পুদা কীভাবে আসল অপরাধীকে ধরল, সেই গল্প শোনার জন্য। জানালার বাইরে শাঁখারীবাজারের সরু গলিতে রিকশার ঘণ্টা আর মানুষের কোলাহল ভেসে আসছে, কিন্তু ঘরের ভেতর সবার মনোযোগ এক জায়গাতেই—লেম্পুদার দিকে। আজকের আড্ডাটা একটু আলাদা। কারণ আজ এসেছে লেম্পুদার সহকারী বেচু মিয়া। কাজের তাগিদে সে প্রায়ই ঢাকার বাইরে থাকে। গ্রাম থেকে গ্রাম, থানা থেকে থানা—খবর জোগাড় করাই তার কাজ। অনেকদিন পর তাকে আবার এই ঘরে দেখা যাচ্ছে। ধুলো মাখা পাঞ্জাবি, চোখে ক্লান্তি, মুখে কৌতূহল। আরো এসেছে তেতি কাইশ্যা ও খুন হওয়া সাদিকের সহকারী। ঘরে হালকা একটা চাপা উত্তেজনা টের পাওয়া যাচ্ছে। লেম্পুদা মুখে সিগারেট গুঁজে রেখেছেন। কিন্তু প্রতিবারের মতো এবারও সেই সিগারেটে আগুন ধরানো হয়নি। সাদিকের সহকারি ছাড়া সবাই জানে—এই দৃশ্যটা নতুন নয়। যারা লেম্পুদাকে চেনে, তারা এটাও জানে যে তিনি সিগারেটের ধোঁয়া তো দূরের কথা, সিগারেটের গন্ধ পর্যন্ত সহ্য করতে পারেন না। তবু সিগারেট হাতের কাছে রাখতেই হবে। কারণ গোয়েন্দা সমাজ বড় নিষ্ঠুর জায়গা। ওখানে গোয়েন্দা মানেই কোটের পকেটে নোটবুক, ম্যাগনিফাইং গ্লাস আর মুখে অবশ্যই জ্বলন্ত সিগারেট বা চুরুট। তামাকের ধোঁয়া ছাড়া পরিপূর্ণ গোয়েন্দা হওয়া যায়না। এই ভয়েই লেম্পুদা নিয়মিত একটা সিগারেট মুখে পুরে রাখেন। আগুন ধরান না, টানও দেন না—শুধু ধরে রাখেন। নয়ত গোয়েন্দা সমাজ কখন যে তাকে বহিষ্কার করে ফেলে বলা যায়না। লেম্পুদা মাঝে মাঝে আয়নার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা একটা আত্মতৃপ্তির হাসি টানছেন। সেই হাসির মানে যেন এই—
দেখেছ? আমিও কম যাই না। বেচু মিয়া একবার তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে ফেলে, কিন্তু কিছু বলে না। বহুদিনের সহকারী হিসেবে সে জানে, এই ভানটা লেম্পুদার সবচেয়ে মজার অভ্যাসও। লেম্পুদা সিগারেটটা আঙুলে ঘোরালেন। চোখ তুলে সবার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “এবারকার ঘটনাটা… আগেরগুলোর মতো সোজা নয়।” বেচু মিয়া লেম্পুদাকে জিজ্ঞাসা করে “স্যার কিভাবে বুঝলেন খুনিটা কমিশনার? লেম্পুদা গলা ঝেড়ে বলল “আরেহ আমি বুঝব না? আমায় যখন কেস দেয়ার জন্য কমিশনার ডাকলো, দেখেছিলাম তার সেলফে সব ডিটেকটিভ বই। দেয়ালে টাঙানো আছে সাদিকের আঁকা ছবি। তার মানে অভদ্রটা সাদিককে আগেই চিনতো। আবার আমি যখন সাদিকের বাসায় তখন কেউ আমার উপর নজরদারি করছিলো। আমি তাকে খুঁজতে বেরিয়ে বেরিয়ে উলটো পথে হেটে যাওয়া পায়ের ছাপ দেখেছি। খুব সতর্ক থেকে কাজটা করেছে। টেকনিকটা শার্লক হোমসের। হোমস পায়ের ছাপ দেখে অনেক কিছুর সমাধা করে। ফটকে থাকা দারোয়ান কাউকে দেখে নাই মানে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটার ভেতরেই কেউ লুকিয়ে ছিলো। ফটকের বাইরে বের হয়নি। বের হলে তাকে দারোয়ান দেখতে পেতো। আর কারো বাসায় ঢুকে ব্রুটালি তাকে হত্যা করে প্রমান লোপাট মেজর ডেভেনফোর্ডের টেকনিক। বেচু মিয়া খানিক বিরক্ত হইয়ে বলল, “স্যার আসলে বুঝাতে পারিনি আপনাকে। মানে কমিশনারই যে সাদিককে খুন করবে তার মোটিভ কি?” লেম্পুদা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “মোটিভ আবার কি? বদটার ছবি সাদিক এঁকেছিলো তার মানে সেই খুনি। কমিশনারের বাড়ি বিলাইছড়িতে। সাদিকের ডায়েরিতে যে ছবি পাওয়া গিয়েছে সে ছবিটি তুলেছে কে? ৪ জন তো ছবির ফ্রেমেই। আমার ধারণা ছিলো সেদিন সেখানে আরো একজন ছিলো। সে অপরাধী না হলেও স্বাক্ষী ছিলো অনেক কিছুর এটা আমার বিশ্বাস। তেতি কাইশ্যা জিজ্ঞাসা করে “স্যার সে কি ট্যুর গাইড?” লেম্পুদা বলে “হ্যা পাহাড়ি ট্যুর গাইড হতে পারে। টাকার লোভেই হয়ত তখন এদেরকে পুলিশে দেয়নি বা তখন স্থানীয় কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু বলেছিলো সেই কিশোরীর ভাইকে…। আমাকে এসব জিজ্ঞাসা করছো কেনো এ্যা ? রিমান্ডে নিয়ে কদিন ইচ্ছাতরফ পেঁদাও, দেখবে সব সুড়সুড় করে বলে দিচ্ছে। প্রথমে দেশি ডিম দিও। বয়স হয়েছে, তাও যদি না বলে তাহলে ফার্মের ডিম। এরপর না বললে রাজাহাঁসের ডিম দিবে। তেতি কাইশ্যা ফিক করে হেসে বলল “স্যার এসবের আর দরকার হবেনা। আসামি বলেছে সে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেবে। সাকিকের সহকারী বলল “স্যার আপনি আমার স্যারের আঁকা ছবিটা খুজে পেলেন কিভাবে?” লেম্পুদা বলে “ও এক গাঁজাখোরের কল্যাণে, আমাকে আঙুলত্বত্ত্ব শেখাচ্ছিলো। তখন খেয়াল হয় আরেহ সাদিকের ডেড বডির হাতের আঙুল কোন দিকে ইশারা করছিলো? এরপর ছবিটা খুঁজে পাই। সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। বেচু মিয়া একটু কাচুমাচু হয়ে লেম্পুদার দিকে তাকাল। এতদিন পর শহরে ফিরেছে, অথচ গুরুত্বপূর্ণ কেসগুলোর কোনো খবরই তার জানা নেই—মুখে অনেক আফসোস। সে লেম্পুদাকে বলল, “স্যার… আপনি তো আমাকে নানান জায়গায় পাঠান। কখনো ফরিদপুর, কখনো ময়মনসিংহ—এভাবে তো আমি অনেক ইন্টারেস্টিং কেসই মিস করে ফেলি। তাহলে আগের কেসগুলোর গল্প জানব কীভাবে?” লেম্পুদার মুখে চাপা হাসিটা ধীরে ধীরে চওড়া হয়ে উঠল। লেম্পুদা বেচু মিয়াকে বলে “এই জন্যই তো ব্যবস্থা করে রেখেছি, বেচু।” বেচু মিয়া অবাক হয়ে তাকাল। “কি ব্যবস্থা?”
“হিমেল নামের একটা ছোঁকড়া আছে বুঝলি,” তিনি বললেন। “লেখালেখি করে টুকটাক। কিসব বিদেশি বই টইটই করে অনুবাদ করে বেড়ায়। আমার খুব বড় ভক্ত। নিয়মিত আসা যাওয়া আমার বাসায়। “ওকে একদিন বলেছিলাম—‘শোন হিমেল, আমার সব এডভেঞ্চার তুই লিখে ফেলবি। যত কেস আমি সমাধান করেছি—রহস্য, রোমাঞ্চ, ধাওয়া, চালাকি—একটাও বাদ দিবি না। ছেলেটা এমন আগ্রহে রাজি হলো যেন গুপ্তধনের মানচিত্র পেয়ে গেছে।” বেচু মিয়া হাসল।
“তারপর?” “তারপর কী,” লেম্পুদা বললেন, “প্রতি সপ্তাহেই আসে। আমি গল্প বলি, আর সে সব রেকর্ড করে নিয়ে যায়। নোটখাতা ভর্তি করে। আমাকে নিয়ে নাকি ডিটেলটিভ বই বের করবে।” ঘরের ভেতর হালকা হাসির রোল উঠল।
কিন্তু সাদিকের সহকারী তখনও চুপচাপ। তার চোখে হাসি নেই, বরং অস্বস্তি। লেম্পুদা বুদ্ধিমান মানুষ। লেম্পুদা সেটা লক্ষ্য না করে পারেন না। । তিনি সাদিকের হাতে একটা খাম তুলে দিলেন । বললেন চাকরি নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবেনা। এই নেও তোমায় নতুন এপয়েন্টমেন্ট লেটার। সমীরণ বাবু দিয়েছেন। তোমার বউ বাচ্চা আছে। সব ভেবেই সমীরণ বাবু তোমায় তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। সজীবের চোখ খুশিতে ভিজে গেছে। তেতি কাইশ্যা কিছু বলতে যাচ্ছিলো, লেম্পুদা হাত তুলে থামিয়ে দিলেন । বললেন “আজ আর নয় ভাই। আজ তোমরা এসো, হিমেল আসবে। ওর আসার সময় হয়েছে। এরপর আবার দেখা হবে.” সবাই বিদায় জানিয়ে একে একে যে যে যার যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলো। সরু সিঁড়ি বেয়ে তাদের পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতে যেতে ঘরটা আবার নিঃশব্দ হয়ে পড়ল। লেম্পুদা দোল চেয়ারে বসে কি যেন ভাবছিলেন অনেক্ষন। বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল। টক—টক—টক। “আসসালামু আলাইকুম স্যার… আসব?” “ওয়ালাইকুম আসসালাম, “হ্যাঁ।” হিমেল এসেছে।
Array

